শিক্ষককে শিক্ষক হতে দিন: আপনার সন্তানের ভবিষ্যতের স্বার্থেই
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় নানা বৈচিত্র্য আছে। ঢাকার মত মেগাসিটিতে অভিভাবকরা যেখানে টিচারের পেশাগত দক্ষতার উপর আস্থা রাখেন, সেখানে অনেক জেলা বা মফস্বলের অভিভাবকদের মধ্যে ঠিক উল্টো চিত্র দেখা যায়। বিশেষ করে মাদারীপুরে কাজ করতে গিয়ে আমি এমন একটি প্রবণতা চোখে দেখেছি, যা অত্যন্ত দুঃখজনক ও চিন্তার বিষয়: অভিভাবকরা মনে করেন, শিক্ষক শুধুই একজন যন্ত্র — যাকে তার ইচ্ছেমত পরিচালনা করা যায়। কখন কী পড়াতে হবে, কীভাবে পড়াতে হবে, কতটুকু পড়াতে হবে — এসবের সবটাই তারা ঠিক করে দিতে চান।
এই প্রবণতা শুধু শিক্ষকের পেশাগত মর্যাদাকেই খাটো করে না, বরং শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্যকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। ভাবুন তো, আপনি কি কখনো একজন সার্জনের কাছে গিয়ে বলেন, “এই অপারেশনটা এমনভাবে করুন, আমার ঠিক এইরকমটাই ভালো লাগে”? বা, আপনি কি কখনো একজন ইঞ্জিনিয়ারকে বলেন, “এই ব্রিজটা এভাবে না বানিয়ে আমার পছন্দমতো বানান”? তাহলে শিক্ষকের ক্ষেত্রে এমনটা কেন?
একজন ভালো শিক্ষক, বিশেষ করে যদি তিনি নিজের বিষয়ের উপর দক্ষ হন, তিনি জানেন কীভাবে কী পড়াতে হয়। তিনি জানেন কোন ছাত্রকে কীভাবে মোটিভেট করতে হবে, কোনটা আগে শেখানো দরকার, কোনটা পরে। তার অভিজ্ঞতা, শিক্ষা এবং ছাত্রের মস্তিষ্কের বিকাশ সম্পর্কে তার জ্ঞান তাকে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম করে তোলে। কিন্তু যখন অভিভাবকরা তাকে প্রতিনিয়ত নির্দেশ দিতে থাকেন, তখন সেই শিক্ষক আর শিক্ষক থাকেন না — তিনি হয়ে যান একজন নির্দেশ-অনুযায়ী কাজ করা শ্রমিক।
এখানে সবচেয়ে বড় যে ক্ষতিটা হয়, সেটা কিন্তু ছাত্রেরই। কারণ শিক্ষক যখন নিজের মত করে কাজ করতে পারেন না, তখন তিনি নিজের সর্বোচ্চটা দিতে পারেন না। তাকে হয়ে উঠতে হয় ব্যাক্তিত্বহীন — যেন একধরনের রোবট, যিনি শুধু অভিভাবকের নির্দেশে চলেন। আর এখানেই শিক্ষার প্রকৃত আত্মা হারিয়ে যায়।
একজন শিক্ষক কেবল বইয়ের জ্ঞান দেন না। তিনি একজন শিক্ষার্থীকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলেন। তার ভেতরের আত্মবিশ্বাস, নৈতিকতা, সময় ব্যবস্থাপনা, দৃষ্টিভঙ্গি — সবকিছুরই বীজ তিনি বপন করেন। কিন্তু যখন একজন শিক্ষক নিজেই ব্যাক্তিত্বহীন হয়ে পড়েন, তখন তিনি আর ছাত্রদের ব্যক্তিত্ব শেখাতে পারেন না। যিনি নিজের মাথা উঁচু করে কথা বলতে পারেন না, যিনি নিজের পেশাদারিত্বের জায়গায় দৃঢ় নন, তিনি কখনোই ছাত্রদের আত্মমর্যাদা শেখাতে পারবেন না।
এটা ironical হলেও সত্য, এই অভিভাবকরাই পরে অভিযোগ করেন, “ছেলেমেয়েরা রেজাল্ট ভালো করলেও কিছু শিখছে না”, “ভালো মানুষ হচ্ছে না”, “নতুন কিছু চিন্তা করতে পারছে না”। কিন্তু একটু ভেবে দেখুন তো — এই ছেলেমেয়েদের গড়ে তুলতে যাদের দায়িত্ব ছিল, সেই শিক্ষকদের কি আপনারা কাজ করতে দিয়েছেন?
এই দেশে অনেক ভালো শিক্ষক আছেন, যাঁরা পড়ানোর জন্য শুধু বই মুখস্থ করান না, বরং শেখান কীভাবে চিন্তা করতে হয়, কীভাবে সমস্যা সমাধান করতে হয়, কীভাবে নিজের মত গড়ে তুলতে হয়। কিন্তু তাঁরা অভিভাবকের অহংকার, সন্দেহ, এবং অবান্তর হস্তক্ষেপের কারণে বাধাগ্রস্ত হন। যার ফলাফল আমরা সবাই ভোগ করি — একটা আত্মবিশ্বাসহীন, চিন্তাশক্তিহীন প্রজন্ম।
আমি বলছি না, শিক্ষকরা ভুল করতে পারেন না। কিংবা অভিভাবকদের কোন মতামত থাকা উচিত না। কিন্তু একটা সম্পর্ক হতে হবে সম্মান এবং পারস্পরিক বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে। আপনি যদি মনে করেন, একজন শিক্ষক আপনার সন্তানের জন্য যথার্থ নয়, আপনি তাকে সরিয়ে দিন — সেটা আপনার অধিকার। কিন্তু কাউকে রেখে, তার কাজে প্রতিনিয়ত হস্তক্ষেপ করে আপনি কখনোই ফল পাবেন না।
ভালো শিক্ষকরা বাধ্য ছেলেমেয়ের মত কাজ করেন না। তারা স্বাধীনচেতা হন, কারণ শিক্ষা স্বাধীনতার মধ্য দিয়েই বিকশিত হয়। আপনি যদি চান, আপনার সন্তান একজন স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারে, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে — তাহলে তার সামনে একজন এমন আদর্শ মানুষ থাকা দরকার, যিনি নিজের কাজ নিজের মত করে করতে পারেন, নিজের চিন্তাকে সম্মান করেন। এমন শিক্ষকই আপনার সন্তানকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবেন।
তাই অভিভাবকদের প্রতি আমার অনুরোধ, শিক্ষকদের শিক্ষক হতে দিন। তাদেরকে ছোট করে দেখবেন না। আপনার সন্তানকে গড়ার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব যদি কারো উপর থাকে, সেটা একজন ভালো শিক্ষকেরই। তাকে যদি আপনি প্রতিনিয়ত সন্দেহ করেন, নিয়ন্ত্রণ করতে চান, তার ব্যাক্তিত্বে আঘাত করেন — তাহলে আপনি আসলে নিজের সন্তানের ভবিষ্যতকেই বাধা দিচ্ছেন।
একজন ভালো শিক্ষক কখনোই আপনাকে “স্যার/ম্যাডাম” বলে আপনার মন রাখতে আসবেন না। তিনি আপনাকে চ্যালেঞ্জ করবেন, আপনার সন্তানকে শেখাতে চাইবেন যা হয়ত আপনার চাহিদার সাথে মেলে না। কিন্তু আপনি যদি তাকে সুযোগ দেন, তাহলে সে আপনার সন্তানের ভবিষ্যত বদলে দিতে পারে।
শেষ কথা, আপনি কী চাচ্ছেন? একজন শিক্ষক, যিনি আপনার সন্তানের জন্য সময়, শ্রম আর চিন্তা দিয়ে একটা ভবিষ্যত গড়বেন? নাকি এমন কাউকে, যিনি আপনাকে খুশি রাখার জন্য “হ্যাঁ স্যার”, “জি ম্যাডাম” বলে আপনার পছন্দমত কাজ করে, কিন্তু আপনার সন্তানকে মানুষ করতে ব্যর্থ হবেন?
পছন্দ আপনার। কিন্তু সেই পছন্দই নির্ধারণ করে দেবে, আপনার সন্তানের ভবিষ্যৎ কেমন হবে।

Comments
Post a Comment